ইউরোপ থেকে যে ধার করা শিক্ষাব্যবস্থায় চলছি আমরা | Decolonization of Education | Enayet Chowdhury

ধরেন আপনাকে যদি আমি এখন জিজ্ঞেস করি ঢাকা কলেজ আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মূল পার্থক্যটা আসলে কোন জায়গায়? দুটোতেই কিন্তু ক্লাসরুম আছে, প্রশাসনিক ভবন আছে, লাইব্রেরী আছে, স্টুডেন্টদের থাকার জন্যে হল আছে। কিন্তু মূলত কোন কারণে আপনি একটাকে বিশ্ববিদ্যালয় বলছেন আর অন্যটাকে কলেজ বলছেন? আরেকটা প্রশ্ন, এইযে আপনি ছোটবেলা থেকেই সাইন্স, আর্টস, কমার্স নিয়ে পড়াশোনা করেন; তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ে যান যেখান থেকে একটা ডিগ্রি নেন। এইযে পড়াশোনার সিস্টেমটা, এটা আসলে আমাদেরকে কে শিখিয়ে দিয়ে গেসে? এটা কি আমাদেরকে ব্রিটিশরা শিখাইসে? যদি ব্রিটিশরা শিখিয়েই থাকে, তাহলে কি ব্রিটিশদের আসার আগ পর্যন্ত আমাদের এই অঞ্চলের মানুষজন পড়াশোনা করতো না? যদি তারাও পড়াশোনা করে থাকে, তাহলে  তারা আমাদের মত সিস্টেমে না করে কোন সিস্টেমে পড়াশোনা করতো? আবার এত বছর পরেও ব্রিটিশরা আসার আগে আমাদের পূর্বপুরুষদের পড়াশোনা সম্পর্কে আমরা কেনো কিছু জানি না? এই পুরো ব্যাপারটি আমি আজকে আলোচনা করবো। তো চলুন শুরু করা যাক।

আপনি ছোটবেলা থেকেই বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে যে সমালোচনাটা শুনছেন যে বাংলাদেশের মানুষ শুধু চাকরি পাওয়া, প্রেম করা আর কনসার্ট শোনার জন্যেই মেইনলি ইউনিভার্সিটিতে যায়! গবেষণা করবে কিংবা জ্ঞান উৎপাদন করবে এইরকম উদ্দেশ্য কারো থাকে না। তাহলে চলেন তো দেখি আমাদের উপমহাদেশীয় অঞ্চলে যখন প্রথম প্রথম উইনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠা করা হয়, তখন অবস্থাটা কিরকম ছিলো! আমাদের এই অঞ্চলে শুরুর দিকে ৩ টা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়।

১. কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়।

২. মাদ্রাস বিশ্ববিদ্যালয়(যেটা চেন্নাইয়ে)

৩. মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়।(যেটা আগে বোম্বাই বিশ্ববিদ্যালয় ছিলো)

মজার ব্যাপার, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম প্রথম কেও পড়াশোনা করতো না, শুধুমাত্র যেত পরীক্ষা দিতে। ওইখানে তখন শুধুমাত্র Matriculation Exam নেওয়া হইতো। এখন এইটা কি টাইপের বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে শুধু পরীক্ষা নেয়, পড়াশোনা করায় না। এইরকম বিশ্ববিদ্যালয় কিন্তু ইউরোপে ছিলো যেটার নাম লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়। এটা একটা অদ্ভুত বা বিরল টাইপের বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে শুধুমাত্র পরীক্ষা নেওয়া হইতো, কেও পড়াশোনা করতে যাইতো না। এরপর অবশ্য ১৮৫৮ সাল থেকে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনা করানো শুরু করে। ১৯০৪ সাল থেকে শুধুমাত্র পরীক্ষা নিতে থাকা কলকাতা, বোম্বাই আর মাদ্রাস বিশ্ববিদ্যালয়, ওরাও পড়াশোনা করানো শুরু করে। কিন্তু মজার ব্যাপার, ওদেরকে সরকার কোনো টাকা দিতো না। আমাদের যেরকম শিক্ষাখাতে বাজেট থাকে, সেরকম কোনো টাকা পয়সা ওরা পাইতো না। এরপর আরো ২ টা বিশ্ববিদ্যালয় এই অঞ্চলে প্রতিষ্ঠা করা হয়, ১৮৮২ সালে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় আর ১৮৮৭ সালে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়। এরমধ্যে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় আবার বার্ষিক ৩০ হাজার রুপি পাইতো। কিন্তু এই অঞ্চলে শিক্ষার মান তখন অতটা ভালো ছিলো না। এটা নিয়ে লন্ডনে প্রচুর সমালোচনা শুরু হয়। ১৮৮২/৮৩ সালে হান্টার কমিশন গঠিত হয়। ওরা ওদের রিপোর্টের মধ্যেও বলে যে এই অঞ্চলের শিক্ষার মান ভালো হইতেছে না। হাতে গুনা কয়েকটা প্রশ্ন পড়েই পরীক্ষা পাশ করা যায়, এই সংস্কৃতি এই অঞ্চলের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রচলিত। এটা আমাদের সংস্কৃতিতেও অনেকাংশে আছে। পরে লর্ড কার্জন, যার নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল আছে, উনি ১৮৯৮ সালে উপমহাদেশের viceroy হয়ে আসেন এবং চিন্তা করেন পুরা শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করার। উনি এসেই কিন্তু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে অন্য বিশ্ববিদ্যালয় গুলোকে শুধুমাত্র পরীক্ষা নেয়া ইনস্টিটিউট থেকে চেঞ্জ করে ওইখানে লেখাপড়া ও শুরু করান। তবে পড়ানোর বিষয়গুলোতে ঝামেলা ছিলো। ওই সময়ে এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেও কৃষিবিদ্যা পড়ানো হইতো যেটা ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যে পড়ানো হতো না। অথচ এই অঞ্চল কতটা কৃষিপ্রধান একবার চিন্তা করেন! আপনি শুনে হাসবেন যে এসব জায়গায় কি পড়ানো হইতো। তিনটা সাবজেক্ট, ইউরোপীয় ইতিহাস, ইউরোপীয় দর্শন ও

ইংরেজি সাহিত্য। এইগুলো ছিলো আমাদের এই অঞ্চলে শুরুর দিকে পড়াশোনার সাবজেক্ট! এটা অদ্ভুত কেন চিন্তা করেন, আমরা আছি ভারতীয় উপমহাদেশে আর পড়ানো হচ্ছে ইউরোপীয় দর্শন ও সাহিত্য! আবারো পড়ানো হচ্ছে ইংরেজি সাহিত্য! সেই ইংরেজি সাহিত্য তৎকালীন ইংল্যান্ডেও পড়ানো শুরু হয় নাই, সেটা তখনকার ভারতীয় উপমহাদেশে পড়ানো হইতো! এটাকে বলা হয় আমাদের শিক্ষার উপরে ঔপনিবেশিক ব্যাবস্থার প্রভাব। ব্রিটিশরা এসে আমাদের সংস্কৃতিকে বাদ দিয়ে ওদের সংস্কৃতি আমাদেরকে শিখানো শুরু করছিলো। পরে এখানে বিজ্ঞান শিখানো শুরু হইসে। কিন্তু সুধুমাত্র চাকরি পাওয়া ছাড়া গবেষণা করা কিংবা নতুন কিছু আবিষ্কারের জন্যে কেও বিজ্ঞান পড়তো না। সবাই শুধুমাত্র চাকরি পাওয়ার জন্যে বিজ্ঞান পড়তো। ১৮৯০ সালে ওই তিনটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৬০ হাজার জনের মত শিক্ষার্থী সার্টিফিকেট পায়। ওদের ৩ ভাগের এক ভাগই ওকালতি করতে চলে যায়। ১৮৮৭ সালের একটা জরিপ অনুযায়ী তখনকার মিডেল রেঞ্জের সরকারি কর্মচারীদের (প্রায় ২১০০০ হাজার জন) মধ্যে প্রায় ৭১% এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করছে। আর বাকি ২৯% ইউরোপ থেকে পড়াশোনা করে আসছে। এই ৭১% এর মধ্যে আবার হিন্দু ছিলো ৪৫%, মুসলিম ছিলো মাত্র ৭% আর ইউরোপিয়ান ছিলো ১৯%। তখনকার সময়েও বাংলার মা বাবাদের একটাই উদ্দেশ্য ছিলো যে ছেলে পরীক্ষায় পাশ করে একটা সরকারি চাকরিতে জয়েন করবে এবং ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা এভাবেই তাদেরকে গড়ে তুলতেছিলো!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিন্তু প্রতিষ্ঠা করা হইসে তারও অনেক পরে, ১৯২১ সালে। এরপর বাংলাদেশে আরো বিশ্ববিদ্যালয় আসে। কিন্তু সব বিশ্ববিদ্যালয়ের গোড়াতে ওই সমস্যাটা ছিলো, সবাই শুধু চাকুরীজীবী উৎপাদন করতেছে। আগে ছিলো ICS আর  এখন BCS। এইধরনের ক্যাডার উৎপাদন করাই বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্য হয়ে গেসে। গবেষণা বা নতুন কিছু উদ্ভাবন করা, এটা অনেকটা আলংকারিক একটা বিষয় হয়ে দাঁড়াইসে। গবেষণা মানে হইতেছে নতুন জ্ঞান তৈরি করা। এখন আইজ্যাক নিউটন যদি শুধুমাত্র চাকরি করার জন্যে ইউনিভার্সিটিতে যাইতো, তাহলে ওর মাথায় আপেল পরার পর সে সেটা সুন্দর মত খাইতে খাইতে বাসায় চলে যাইতো। এই আপেলটা কেনো তার মাথার উপরে পরছে এবং এটা থেকে মধ্যাকর্ষণ আবিষ্কার করা তার পক্ষে সম্ভব হইতো না। এখন একটা মজার ব্যাপার, চাকরি করা কিংবা BCS এ পাশ করার জন্যই শুধুমাত্র ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করা লাগবে, এই ধারণাটা কি শুধুমাত্র বাংলাদেশেই ছিলো? না না না, এটা একটা ভুল ধারণা। আমেরিকার ক্ষেত্রে চিন্তা করেন বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন এর কথা, উনি জন লকের দ্বারা অনেক অনুপ্রাণিত ছিলেন। উনার মতে আমাদের তরুণদেরকে এমন শিক্ষা দিতে হবে যেটা সম্পর্কে পড়াশোনা করে তারা অন্তত একটা চাকরি নিতে পারে। এটাকে প্রায়োগিক শিক্ষা বলা হইতেছে। ফ্রাঙ্কলিন কিন্তু এই উদ্দেশ্য থেকেই ১৭৫০ সালে পেনসিলভেনিয়ায় ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠা করেন। এর আরো পড়ে ১৮৬২ সালে আব্রাহাম লিংকন নতুন অ্যাক্ট জারি করেন। ওইসময় যুক্তরাষ্ট্রে গৃহযুদ্ধ চলতেছিলো। তো শিক্ষা ব্যাবস্থার অবস্থা খুবই খারাপ ছিলো। যুক্তরাষ্টের প্রত্যেক সংসদ সদস্যকে এটা বললে দেওয়া হইসিলো যে আপনি আপনার ৩০ হাজার একর জমি সরকারের অধীনে বিক্রি করে দিতে পারেন এবং ওই টাকাটা শেয়ার মার্কেট কিংবা অন্য কোনো জায়গাতে আপনি ইনভেস্ট করবেন যেখান থেকে প্রত্যেক বছর অন্তত ৫% লাভ আসবে। এই টাকাটা দিয়ে আপনি নতুন একটা কলেজ দেখভাল করবেন কিংবা প্রতিষ্ঠা করবেন। এইযে জমি বিক্রি করে যে ইউনিভার্সিটি গুলো তৈরি করা হইসে, এগুলোকেই বলা হয় ল্যান্ড গ্র্যান্ট ইউনিভার্সিটিস এবং এইভাবে প্রায় কয়েক হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করা হইছিলো। এটা যে অধ্যাদেশের মাধ্যমে করা হয়, সেটার নাম হচ্ছে মরিল অধ্যাদেশ বা মরিল অ্যাক্ট। একটা সময় ইউনিভার্সিটি গুলোতে শুধুমাত্র বড়লোকদের পোলাপানই পড়াশোনা করতো, এই ল্যান্ড গ্র্যান্ট ইউনিভার্সিটি গুলো হওয়ার পরে কৃষকের সন্তান, শ্রমিকের সন্তান সবাই ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সুযোগ পায় (যেহেতু কম টাকায় পড়া যেতো) এবং ওরা কিন্তু ঐখান থেকে বের হয়ে অনেক চাকরিতে ঢুকতো। সুতরাং আমেরিকারও ইউনিভার্সিটি গুলো শুরু হইসিলো এই চাকুরীজীবী উৎপাদন করার লক্ষ্যেই। ওদের প্রথম ইউনিভার্সিটি যেটা গবেষণাকে প্রাধান্য দিসে, ঐটা হলো ১৮৭৬ সালে প্রতিষ্ঠা করা জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটি। খুবই বিখ্যাত, আমারও যাওয়ার ইচ্ছা আছে কিন্তু জীবনেও কোনোদিন যাইতে পারবো না। শুধু এইটা না, আপনি মদ্ধযুগে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচির মধ্যে আসেন, দেখবেন ৪ টা অনুষদ আছে। পড়ানো হইতো আইন, ধর্মতত্ত্ব, চিকিৎসা, কলা (আর্টস)। এরমধ্যে ধর্মতত্ত্ব, চিকিৎসা আর আইন বিষয়ে পড়াশোনা করে যেহেতু মানুষ চাকরি পাইতো, তাই এগুলোকে উচ্চতর ধারা বলা হইতো। আর কলা বা আর্টস পড়ে কেও কোনোদিন চাকরি পায় নাই, এই কারণে এটাকে নিম্ন ধারা বলা হইতো। ১২২০ সালের আগেই কলা বা আর্টস পড়ার প্রচলন ছিলো। আপনারা এখনো যে চিন্তা করেন “দর্শন পড়ে কি হবে? পালি ভাষা শিক্ষা করে কি হবে?” এইটা শুধু আজকের সমস্যা না,এটা সেই মদ্ধযুগ থেকেই ছিলো। 

এইখান থেকেই কিন্তু আরেকটা প্রশ্ন দাড়ায়, ব্রিটিশরা আসার আগে আমরা কি এইজায়গায় পড়াশোনা করতাম না? আমাদের কি নিজস্ব কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ছিলো না? যদি থাকে তাহলে সেখানে কি পড়াতো? অবশ্যই ছিলো! একটা একটা করে বলি। বিতর্ক সাপেক্ষে পৃথিবীর প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম হচ্ছে নালন্দা এবং এটা আমাদের এই ভারতবর্ষেই অবস্থিত। আনুমানিক চতুর্থ শতকের দিকে এই নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয় যেটা ভারতের বিহার রাজ্যের অন্তর্গত। এরপর আনুমানিক অষ্টম শতকের দিকে বিক্রমশিলা, সোমপুর আর ওদন্তপুরী তে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরমধ্যে সোমপুর বাংলাদেশের পাহাড়পুরে অবস্থিত। এইগুলো প্রতিষ্ঠা করেন ধর্মপাল। পর্যটক Xuanzang এর ভ্রমণকাহিনী থেকে এইসকল বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। আনুমানিক সপ্তম শতকের দিকে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ওদের একদম পিক এ ছিলো! ধারণা করা হয় ওইসময় নালন্দায় প্রায় ২০০০ শিক্ষক ছিলেন আর ১০ হাজার ছাত্র ছিলো। Xuanzang যখন গেছেন, তখন ওইখানে প্রায় ৬০০০ এর মত শিক্ষার্থী ছিলো। ওইসময় কোরিয়া, জাপান, চীন, তিব্বত, ইন্দোনেশিয়া, এমনকি তুরস্ক থেকেও মানুষজন এই নালন্দা তে পড়াশোনা করতে আসতো। আর এখন চিন্তা করেন, আমরা ওদের ওইখানে পড়াশোনা করতে যাই! তখনকার সময় ইউনিভার্সিটি রাঙ্কিং করা খুব দরকার ছিলো। সাব কন্টিনেন্ট এর ইউনিভার্সিটি গুলো সব নম্বর ওয়ান এ থাকতো। ওগুলো ছিলো তখনকার MIT, হার্ভার্ড, অক্সফোর্ড! ওইসময় নালন্দায় ৩ টা লাইব্রেরী ছিলো, খুবই অদ্ভুত অদ্ভুদ নাম; রত্নসাগর, রত্নদধি, রত্নরঞ্জক। এরমধ্যে রত্নদধিই নাকি ছিলো প্রায় ৯ তলার সমান। এছাড়া এখানে প্রায় ১০০ টা ক্লাসরুম ছিলো। বিতর্ক কিংবা সভা করার জন্যে আলাদা রুম থাকতো। বাই দা ওয়ে, আমিও কিন্তু একসময় বিতর্ক করতাম। ওইসময় নালন্দা আর সোমপুর বিহারে দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, গণিত এবং জোতির্বিদ্যা নিয়ে এমন এমন শাস্ত্রগ্রন্থ লেখা হইসে যেটা পরবর্তীতে বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করা হইসে। এছাড়া এগুলো নিয়ে আজকের দিনেও বিভিন্ন জার্নালে গবেষণাপত্র লেখা হয়। ১০ বা ১১ শতকের দিকে এই অঞ্চলে যে বিহার ভিত্তিক পড়াশোনা ছিলো, এটার প্রচলন কমা শুরু করে। কিন্তু বাংলায় বল্লাল সেন জ্ঞান চর্চার এই ধারাটিকে আবারো প্রতিষ্ঠা করেন। উনি ১১/১২ শতকে শাস্ত্রীয় শিক্ষা চর্চার জন্যে বাংলার বাইরে থেকে প্রচুর ব্রাহ্মণদেরকে বাংলার ভিতরে নিয়ে আসেন যেটা আমেরিকা এখন করে। তারা বিদেশি দেশগুলো যেমন চীন, বাংলাদেশ, ইন্ডিয়া ইত্যাদি থেকে ভালো ভালো স্টুডেন্টদেরকে নিজের দেশে নিয়ে আসে। তো উনি ওদেরকে উর্বর গ্রাম দান করে দিসিলেন যেনো তারা ভালোমত থাকতে পারে এবং তাদের কোনো অসুবিধা না হয়। পরবর্তিতে যখন নবাবী আমল আসে, যখন মুসলমান আমল আসে, তখন শাস্ত্রীয় চর্চার ক্ষেত্রে এই উপমহাদেশ একেবারে কেন্দ্রে বা চূড়ায় উঠে যায়! এক্ষেত্রে মুসলমান শাসকদের অনেক বড় অবদান ছিলো! আমি জানি আপনি খুশি হয়ে গেছেন। কিন্তু ১৮ শতকের শেষ দিকে বাংলার শিক্ষা ব্যাবস্থা একটু খারাপের দিকে যায়। তখন নদীয়ার একটা টাউন নবদ্বীপ, ওইখানে শিক্ষ্ক শিক্ষিকার সংখ্যা দিন দিন কমতে থাকে। যেমন ১৬৮০ খ্রিস্টাব্দে ওইখানে ছাত্র ছিলো ৪ হাজার আর অধ্যাপক ছিলো ৬০০, ১৭৯১ সালে ছাত্র কমে হইসে ১১০০ আর অধ্যাপক ছিলো মাত্র ৪০০ জন। ১৮৬৭ সালে এসে ছাত্র ছিলো মাত্র ১৫০ আর অধ্যাপক তো আর নাই বা বললাম, অনেক কম! এইভাবে আস্তে আস্তে ঐতিহাসিকভাবে আমাদের শিক্ষা ব্যাবস্থাটা দুর্বল হইতে থাকে। 

আমাদের এই অঞ্চলের শিক্ষা ব্যাবস্থা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটা খুব সুন্দর কথা বলছেন, “বিশ্ববিদ্যালয় চিরদিনই বিলেতের আমদানীকৃত টবের গাছ হয়ে থাকবে, সে টব মূল্যবান হতে পারে অলংকৃত হতে পারে কিন্তু গাছকে সে চিরদিনই পৃথক করে রাখবে ভারতবর্ষের মাটি থেকে। বিশ্ববিদ্যালয় দেশের শখের জিনিস হবে, প্রাণের জিনিস হবেনা।” 

মোট কথা আমরা যে পড়াশোনা করতেছি, তার সাথে ভারতবর্ষের যে যোগসূত্রটা থাকা দরকার ছিলো ঐটা আমাদের এখানে নাই কারণ সিস্টেমটাই হইতেসে ইউরোপ থেকে আমদানি করা। ব্রিটিশরা আমাদের দিয়ে গেসে। 

আজকের এই আলোচনাটা সৈয়দ নিজার স্যার এর “বিশ্ববিদ্যালয় উদ্ভব বিকাশ ও বিউপনিবেশায়ন” বইটির উপর ভিত্তি করে করা। 

আজকে আমি মূলত দেখানোর চেষ্টা করছি ৩ টা জিনিস। ১. শুধুমাত্র চাকরি পাওয়ার জন্যেই আমি পড়াশোনা করবো, কোনো ধরনের গবেষণাতে আমি যাবো না। এই ট্রেন্ড টা শুধুমাত্র আমাদের সময়ই না, এই উপমহাদেশে যখন শিক্ষাব্যবস্থা চালু হয় তখন থেকেই ছিলো।

২. এই ট্রেন্ড টা শুধুমাত্র উপমহাদেশের মধ্যেই না, এমনকি আমেরিকা কিংবা ইউরোপের মধ্যেও ছিলো। কিন্তু ওরা পরবর্তীতে গবেষণা কেন্দ্রিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করছে এবং অনেক বেশি এগিয়ে গেসে গবেষণা এবং উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে যেটা আমরা এখন পর্যন্ত পারতেছি না। কিন্তু আমরা চেষ্টা করতেছি।

৩. ব্রিটিশরা আসার আগেও আমরা পড়াশোনা করতাম, একেবারে গরু গাধা ছিলাম না, এই ব্যাপারটা নালন্দা কিংবা সোমপুর এর উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করলাম। 

আজকে এই পর্যন্তই। সবাই ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন। 

আল্লাহ্ হাফিজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.