শুধু কি বাঙ্গালীরাই ভাষার জন্য জীবন দিয়েছিল? Language Movement of Bangladesh | Enayet Chowdhury

ফেব্রুয়ারি মাস আসলেই আমরা বাংলা ভাষাকে নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে শুরু করি। এই যেমন বিভিন্ন ব্র্যান্ড আঞ্চলিক ভাষাকে বেশ ভালোভাবে প্রমোট করছে। ভাষার জন্যে ১৯৫২ সালে আমাদের রক্ত ঝরেছে! কিন্তু আপনি কি জানেন শুধুমাত্র বাঙালিরাই একমাত্র জাতি না যারা ভাষার জন্যে রক্ত দিয়েছে? ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা কতখানি ছিলো? পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন উভয়ই বাঙালি ছিলো। তাহলে কেনোই বা তারা রাষ্ট্র ভাষাকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করলো? এই পুরো ব্যাপারটি আমি আজকে আলোচনা করবো। তো চলুন শুরু করা যাক।

প্রথমে চলেন দেখি বাঙালিরা ছাড়া আর কারা কারা ভাষার জন্যে লড়াই করছে! ভারত ভাগের আগে, অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের পূর্ববর্তী সময়ে ১৯৩৭ সালে ইন্ডিয়ার হিন্দি ভাষী অনেক বড় বড় নেতা হিন্দিকে তামিলনাড়ু বা তৎকালীন মাদ্রাজে ভাষার উপরে আবশ্যক করে দেওয়ার চেষ্টা করছিলো। ১৯৩৭ এ তৎকালীন প্রথম কংগ্রেস মিনিস্ট্রি বা মন্ত্রনালয়ের হেড Chakravarty Rajagopalachari বলছিলেন এখন থেকে মাদ্রাজে(বর্তমান তামিলনাড়ু) প্রত্যেকটা স্কুলে হিন্দি শেখা বাধ্যতামূলক হবে। হিন্দি না শিখলে পাশ করতে দেয়া হবে না। এটা ছাড়াও কংগ্রেসের মেইন যে নেতারা ছিলো ওই সময়ে; যেমন মহাত্মা গান্ধী, জহরুলাল নেহেরু, বল্লভভাই পাটেল, মওলানা আজাদ, উনারা সকলেই কিন্তু হিন্দিতে কথা বলতো। ওই এরিয়ার ৭০% মানুষ কিন্তু তামিল ভাষায় কথা বলতো। এই ভাষাটার হাজার বছরের একটা ইতিহাস আছে এবং এটা ইন্ডিয়ার সবচেয়ে পুরাতন ভাষাগুলোর মধ্যে একটা। প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ অব্দের দিকে তামিল ভাষায় উৎপত্তি হয়েছিলো। এখন ধরেন আপনি যদি হিন্দিকে বাধ্যতামূলক করে ভাষার আইন তৈরি করেন, সেটা তো তামিলনাড়ুর মানুষজন মানবে না! তো ওরা মাদ্রাজ সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি আন্দোলনে নামছিলো। তাহলে দেখেন ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলনের আগে ১৯৩৭-৩৯ সালে অলরেডি কিন্তু বর্তমান তামিলনাড়ুতে ভাষার জন্যে একটা আন্দোলন হয়ে গেছে। ওই দুই বছরের মধ্যে প্রায় ২০০০ নারী ও পুরুষদের বন্দি করা হয়। এখন কিছু একটা চেঞ্জ হয়ে গেসে! 

এখন আসেন, ভারত ভাগের আগের এই কাহিনী নিয়া ওদের শিক্ষা হয় নাই। ভারত ভাগের পরেও ওরা ঝামেলা করছিলো! ২৬ জানুয়ারি ১৯৫০, বারোটার সংবিধানে একটা ধারা জারি করা হয়। ওইখানে বলা হয় হিন্দি হবে প্রত্যেকটা প্রদেশের প্রধান ভাষা এবং এটা পরবর্তী ১৫ বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে! এটা শুনে তামিলনাড়ুর ছাত্রছাত্রীরা ধুমছে বিক্ষোভ শুরু করছে! জোহরুলাল নেহেরু তখন মাদ্রাজে ১৯৫৮ সালে ভ্রমণ করতে যান, ওইখানে গিয়ে বলেন যে তোমরা ভাষার জন্যে যে আন্দোলন করছো সেটা পুরাই স্টুপিড বা বোকার মত কাজ। ১৯৫২ সালে খাজা নাজিমউদ্দিন যে ভুলটা করছিলো, ও ১৯৫৮ তে আইসা সেই ভুলটাই করলো! ওইদিন প্রায় ৩০০ মানুষের উপর গুলি চালনো হয়। পরবর্তী বছরগুলোতে নেহেরু বুঝতে পারছে যে দক্ষিণ ভারতের মানুষগুলোকে এভাবে খেপানো উচিত না। তাই উনি ১৯৬৩ সালে সংবিধানে ভাষা সংক্রান্ত এই ধারাটিকে সংশোধন করেন এবং বলেন ১৯৬৫ এর জানুয়ারির পরে যেকোনো প্রদেশ ইংরেজি ভাষাকে ব্যবহার করতে পারবে। যেটাই হোক, তামিলনাড়ুর ছাত্রছাত্রীরা কিন্তু তখনও প্রতিবাদ করতেছিলো! নেহেরু যখন হটাৎ করে মারা গেলেন, তখন লাল বাহাদুর শাস্ত্রী ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন। ২৫ শে জানুয়ারি, যেইদিন ওই ধারাটিকে সংশোধন করা হবে, তার আগেরদিন তামিলনাড়ুর ছাত্রছাত্রীরা বেশ বড় ধরনের প্রতিবাদ সমাবেশ করে এবং পুলিশ ওদের উপর সরাসরি আক্রমণ করে। ২ জন স্কুলের ছাত্র নিজেদের গায়ে আগুন লাগায় দেয়। তো এইধরনের প্রতিবাদের পর অন্য যেসব নন হিন্দি স্পিকিং প্রদেশ ছিল, যেমন আসাম, বেঙ্গল ইত্যাদি, ওরাও বেশ নড়েচড়ে বসছে। ওরাও প্রতিবাদ করা শুরু করছে। তামিলনাড়ুতে নিহতের সংখ্যা প্রায় ৩০০ ছুঁয়েছিল আর শাস্ত্রী সরকারের ২ জন ইউনিয়ন মিনিস্টার পদত্যাগ করতে বাধ্য হইসিলো। এত দাঙ্গা হাঙ্গামার পরে শেষমেশ তামিলনাড়ুর মানুষদের কথা মেনে নেওয়া হয় এবং কংগ্রেস তামিলনাড়ু থেকে চিরবিদায় নেয়। শুধুমাত্র ভারতবর্ষেই কিন্তু না, আপনি যদি আয়ারল্যান্ড এর দিকে তাকান, ওইখানে লেঙ্গুয়েজ ফ্রিডম মুভমেন্ট নামে একটা পলিটিকাল অর্গানাইজেশন ই আছে। এটা ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হইসিলো। ওই আন্দোলনের সময় কোনো ছাত্র বা ছাত্রী যদি আইরিশ লেঙ্গুয়েজে পাশ করতে না পারতো, তাহলে ওরে পুরা পরীক্ষায় ফেল বলে ঘোষণা করা হইতো। চিন্তা করে দেখেন! এখানে বলে রাখি, আমি বাংলাতে যে পরিমাণে নম্বর পাইতাম, যদি বাংলাকে এরকমভাবে মাস্ট পাশ হিসেবে ঘোষণা করা হইতো, আমি তাহলে প্রত্যেকটা এক্সামে ফেইল করতাম। কোনো এক অদ্ভুত কারণে আমার বাংলা হাতের লেখা দ্রুত না, সবসময় তাই কম নম্বর পেতাম। তো ওদের আন্দোলনের মুখে ১৯৭৩ সালে এই আইনটিকে ধুলিস্যাৎ করে দেওয়া হয়। 

এখন চলেন দেখি খাজা নাজিমউদ্দিন নিজে বাঙালি হওয়ার পরেও কেনো বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে মত দেন নাই? প্রথম কথা নাজিমউদ্দিন নিজে বাংলা বলতেই পারতো না! তখন ঢাকার নবাব পরিবারের মধ্যে উর্দুতে কথাবার্তা হইতো। বাংলা উনার মাতৃভাষাও ছিলো না। উনি যখন বাংলায় ভাষণ টা দিসিলেন, উনি কিন্তু বাংলায় খুব বেশি দক্ষ ছিলেন না। তৎকালীন সময়ে করাচিতে বাংলাদেশ সরকারের অফিসিয়াল ছিলেন যার নাম মিজানুর রহমান। উনি পুরা স্ক্রিপ্ট কে উর্দুতে কনভার্ট করে দিসিলেন। এই খাজা নাজিমউদ্দিন কিন্তু মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মধ্যে একটা সিঙ্গেল বা একীভূত পাকিস্তানে বিশ্বাস করতেন। পাকিস্তানকে ভাগ করা বিষয়টা উনি পছন্দ করতেন না। তাছাড়া খাজা নাজিমউদ্দিন মুসলিম গ্রুপের মধ্যে অবাঙালিদের সাথেই বেশি উঠাবসা করতো। উনি যখন ক্ষমতায় আসছিলেন, তখন পাকিস্তানের পাওয়ার স্ট্রাকচার কে একীভূত করে রাখতে অনেক বেশি চেষ্টা করছিলেন। তো বুঝে গেলেন বাঙালি হওয়ার পরেও খাজা নাজিমউদ্দিন এর উর্দুকে সাপোর্ট করার বিষয়টা একেবারে আশ্চর্য্যজনক নয়। 

এখন চলেন দেখি, তমদ্দুন মজলিস ভাষা আন্দোলনে কি কি ভূমিকা রাখছে! প্রিন্সিপাল আবুল কাশেম ছিলেন ভাষা আন্দোলনের ভুলে যাওয়া মানুষদের মধ্যে একজন। ১৯৪৭ এর সেপ্টেম্বরের ১ তারিখ উনার নেতৃত্বে পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিস নামে সংস্থাটি গঠিত হয় যে ভাষা আন্দোলন নিয়ে কাজ করা প্রথম সংস্থা। ১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭ এ উনি একটা পুস্তিকা প্রকাশ করেন যেটার নাম “রাষ্ট্রভাষা বাংলা নাকি উর্দু?” যেখানে উনি বাংলাকে প্রাদেশিক ভাষার পক্ষে জোরালো বক্তব্য দেন। উনার দাবিগুলোর মধ্যে মূল দাবিগুলো ছিলো, বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তান এর প্রশাসনিক ভাষা করতে হবে। আইন কিনবা কোর্ট লেঙ্গুয়েজ করতে হবে যেখানে আদালতের মধ্যে বাংলা ভাষা ব্যাবহার করা হবে, আর পূর্বপাকিস্তানের দাপ্তরিক ভাষা হবে বাংলা। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের ভাষা হবে দুটো (বাংলা ও উর্দু)। উনারা যখন উনাদের এই পুস্তিকাটি প্রকাশ করছিলেন, তখন ৫ জন মানুষও উনারা পান নাই যারা এই পুস্তিকাটি ক্রয় করবে। উনারা একটা গণস্বাক্ষর কর্মসূচি আয়োজন করেন যেখানে উনারা বিখ্যাত ব্যাক্তিদের স্বাক্ষর জোগাড় করছিলেন। এটা পাকিস্তান সরকারের কাছে পাঠানো হয়, এমনকি কিছু সংবাদপত্রেও এটা প্রকাশ করা হয়। ফজলুল হক হলের মধ্যে উনাদের সভা শেষ করার পরে তমদ্দুন মজলিসের সদস্যরা এই সিদ্ধান্ত নেন যে উনারা রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ নামে একটা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করবেন। ১৯৪৮ এ যে ঘটনাগুলো হইসে, ওইখানে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ অনেক গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করছিলো। এখন ভাষা আন্দোলনের যে প্রসারটা হইসে, ওইটার পিছনে সাপ্তাহিক সৈনিক পত্রিকার একটা বড় অবদান ছিলো। ১৯৪৮ সালের ১৪ ই নভেম্বর প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক সৈনিক পত্রিকা। এই পত্রিকাটা বের করেন তমদ্দুন মজলিসের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আবুল কাশেম। তখন এইটার সম্পাদক ছিলেন আব্দুল গফুর। যেহেতু ওরা সরকারের বিরুদ্ধাচরণ করছিলো, এই পত্রিকাটিকে ধরা হয় প্রথম সরকার বিরোধী পত্রিকা। তো তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তো খুবই খেপা ওদের উপরে! সরকার প্রফেসর আবুল কাশেম এবং সম্পাদক আব্দুল গফুরকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেয় আর ওই সময়ে উনারা বেশিরভাগ সময় পলাতক ছিলেন। পরবর্তীতে এই পত্রিকা পূর্ব পাকিস্তান এর মধ্যে বেশ প্রসার লাভ করে কারণ এইখানে সরকার বিরোধী দলগুলোর বক্তব্য, বিবৃতি আর বিভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ড বেশ গুরুত্বের সাথে প্রকাশিত হইতে থাকে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন যখন একেবারে তুঙ্গে, তখন এরা এই পত্রিকার একই দিনে একাধিক সংস্করণ বের করছিলো। ২২ ও ২৩ শে ফেব্রুয়ারিতে এই পত্রিকার ৩ টি সংস্করণ বের করা হয়। এটা খুবই বড় একটা জিনিস কারণ এটা ছিলো সাপ্তাহিক পত্রিকা! 

এখন এটা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন করেছিলেন যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষা আন্দোলনে ভূমিকা আসলে কতটুক? বঙ্গবন্ধুর প্রথম যে আত্মজীবনী লেখক ছিলেন, উনি হলেন অধ্যাপক ড মাজহারুল ইসলাম। তিনি তার বইয়ের মধ্যে বলছেন ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদ ক্যাম্পেইন এর মধ্যে বাংলা ভাষাকে সমর্থন করার জন্যে অনেক মানুষের স্বাক্ষর সংগ্রহ করছিলো, ওই ক্যাম্পেইন এ শেখ মুজিবুর রহমানও অংশগ্রহণ করছিলেন। ১৯৪৮ সালের মার্চের ১১ তারিখ, এটা ভাষা আন্দোলনের জন্যে অনেক তাৎপর্যপূর্ণ একটা দিন। ওইদিন বাংলাকে প্রাদেশিক ভাষা করার জন্যে সর্বস্তরের আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয় এবং এটা পাকিস্তানে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে সর্বপ্রথম সফল কোনো আন্দোলন। শেখ মুজিবুর রহমান এই আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় একজন ব্যাক্তি ছিলেন এবং পুলিশের নির্যাতন সহ্য করার পর উনাকে গ্রেফতার করা হয়। উনাকে ১৫ই মার্চ আবার ছেড়ে দেওয়া হয়। শেখ মুজিবুর রহমান কিন্তু ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময়ে নিজে জেলে ছিলেন, কিন্তু উনি জেল থেকে নিয়মিত ভিত্তিতে ভাষা আন্দোলনের যে মূল কারিগররা ছিলেন, তাদের সাথে অনেক যোগাযোগ রাখতেন। এটা নিয়ে তিনি তার অসমাপ্ত আত্মজীবনী এর মধ্যেও কথা বলছিলেন। 

তো সব মিলিয়ে আজ এই পর্যন্তই। ভাষা আন্দোলন নিয়ে আপনারা ফেসবুক পোস্টে যে প্রশ্নগুলো করছিলেন, আশা করি সেগুলোর উত্তর কিছু হইলেও পাইসেন। যদিও এত প্রস্ন আসছে যে সবগুলোর উত্তর দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি! 

সবাই ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন। আল্লাহ্ হাফিজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.