সৃষ্টির শুরু দেখাবে যে টেলিস্কোপ!!! James Webb Telescope in Bangla | Explained by Enayet Chowdhury

আপনাকে যদি আমি এমন একটা ক্যামেরা দেই যা দিয়ে আপনি দেখতে পারবেন পৃথিবী এবং অন্যান্য গ্রহ নক্ষত্র কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিলো,তাহলে সেটা কিন্তু কোনো টাইম মেশিনের থেকে কম কিছু না যা আপনাকে একদম সৃষ্টির শুরুতে নিয়ে যাবে। জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ হচ্ছে সেরকমই একটা জিনিস যা গত ২৫ শে ডিসেম্বর বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ০৬:২০ মিনিটে মহাকাশে লঞ্চ করা হয় এবং সেটা সফলভাবে প্রাথমিক ডিকাপলিং শেষ করে। এইটা একটা ঐতিহাসিক মুহূর্ত কারণ এই প্রজেক্টটা শেষ করতে প্রায় ৩০ বছর সময় লাগছে আর ১০ বিলিয়ন ডলার খরচ হইসে। আমি পুরা সময়টা লাইভ দেখতেছিলাম এবং অদ্ভুতভাবে খেয়াল করলাম নাসার সাইন্টিস্টদের টেবিলের সামনে গোলাপী কালারের পুতুল থাকে। “আমি এই মাত্র কি দেখলাম ওদের অফিসে!” যাই হোক, জেমস স্কোপ টেলিস্কোপটা কেনো এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ! এত ডলার খরচ করে আমাদের আসলে লাভ টা কি আর সবাই কেনো এই টেলিস্কোপ নিয়ে এত বেশি পরিমাণ লাফালাফি করতেছে, এই পুরো ব্যাপারটা আমি আজকে ব্যাখ্যা করবো, তো চলুন শুরু করা যাক। 

এই টেলিস্কোপের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহে সাহায্য করেছেন IUT এর অ্যাস্ট্রোনমি গ্রুপ আলফাজারি ইন্টারস্টেলার সোসাইটি। প্যানডেমিক এর সময় যাত্রা শুরু করা এই সোসাইটি ইঞ্জিনিয়ারিং এর সাথে জোতির্বিজ্ঞান এবং জোতি পদার্থবিজ্ঞান বা অ্যাস্ট্রোফিজিক্স এর যে একটা কো রিলেশন আছে, সেটা নিয়ে কাজ করছে। তাদের ফেসবুক পেজ এবং ইনস্টাগ্রাম এর লিংক আমি দিয়ে দিবো। প্রথমে জানা দরকার এই টেলিস্কোপটা দিয়ে মোটের উপরে আসলে কি হবে! দেখেন আমি আপনি কিন্তু এখন পর্যন্ত জানি না এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড, এই গ্রহ নক্ষত্র কিভাবে সৃষ্টি হয়েছে। বলতেছিনা আপনাদের সবার এটা দেখার খুব ইচ্ছা আছে, কিন্তু জিনিসটা জানা থাকলে আসলে ভালো। শুধু আমরা জানি বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণ নামে একটা জিনিস ঘটছিলো। যখন এই বিগ ব্যাং হইসিলো তখন পুরা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে ৩ টা মৌলিক উপাদান ছিলো। এক হাইড্রোজেন, দুই হিলিয়াম আর তিন অল্প পরিমাণে লিথিয়াম। পরবর্তীতে জীবনের জন্যে যত ধরনের উপাদান আছে যেমন অক্সিজেন,পানি ইত্যাদি পরবর্তীতে গঠিত হইসে বিভিন্ন সময় নক্ষত্রের কেন্দ্রে যে নিউক্লিয়ার বিক্রিয়াগুলো হইসে সেগুলোর মাধ্যমে। জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ আমাদেরকে এইসব দেখাবে যে বিগ ব্যাং এর পরবর্তী সময়ে এই এতকিছু কিভাবে তৈরি হইসে এবং আমরা যে মৌলিক প্রশ্নের সম্মুখীন হইসি যে আমরা ঠিক কোথা থেকে আসছি বা আমাদের সৃষ্টি কোথা থেকে হইসে, এই ব্যাপারটায় আমাদের ধারণা দিবে। আপনি কিন্তু আকাশে অনেক তারা দেখেন, কিন্তু এমনও হইতে পারে আপনি কোনো একটা তারার আলো দেখতেছেন যেটা আপনার কাছে এই মুহূর্তে এসে পৌঁছাইতেছে কিন্তু তারাটা মিলিয়ন মিলিয়ন বছর আগেই মারা গেছে। যেমন সূর্য থেকে আলো পৃথিবী পর্যন্ত পৌছাইতে কিন্তু ৮ মিনিট সময় লাগে। হাইপোথিটিকালি চিন্তা করেন, বিগ ব্যাং এর সময় একটা তারা থেকে কিছু আলো হয়তো আসতেছে যা হয়তো এইমাত্র আপনার চোখের মধ্যে পরছে কিন্তু তারাটা এখন নাই। কিন্তু আপনি তো সেই আলোটা দেখতে পাইতেছেন। এই আলোগুলোই ক্যাপচার করবে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ যেটা সাধারণ কোনো টেলিস্কোপের মাধ্যমে দেখা যায়না এবং এটা মানবজাতির ইতিহাসের মধ্যে সর্বপ্রথমবার ঘটতে যাইতেছে। একটা সময়ের কথা এখানে বলা হয় যার নাম রিআয়নাইজেশণ এপোক (Reionization Epoch), ওই সময়টাতে শুধুমাত্র মহাবিশ্বের প্রথম যে নক্ষত্র বা গ্যালাক্সিগুলো ছিলো, ওইগুলো তৈরি হইতেছিলো এবং যেহেতু জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ এইগুলোর আলো ক্যাপচার করতে পারবে,তাই এটা নিয়ে মানুষ অনেক বেশি এক্সাইটেড। দ্বিতীয় কারণ এই এক্সাইটমেন্টের, জেমস ওয়েব টেলিস্কোপকে একটা রকেট এর ভিতরে ফিট করার জন্যে ওকে বিভিন্নভাবে ফোল্ড করা লাগছে, অর্থাৎ ভাঁজ করা লাগছে। এরকম টেকনোলজির ইন্সপিরেশনটা আসছে একটা শিল্প থেকে যার নাম হচ্ছে অরিগামি। কাগজ দিয়ে বিভিন্ন সুন্দর সুন্দর জিনিস আপনি বানাইতে পারবেন যেটা মূলত একটা জাপানিজ ট্রাডিশন। জাপানে কিন্তু একজন লিজেন্ড আছে,আপনি যদি কাগজ দিয়ে শারশ পাখি বানান যেটা অরিগামির একটা এক্সাম্পল এবং এরকম এক হাজার টা শারশ পাখি বানানোর পরে সেটাকে যদি একটা কাচের বোতলে ভরে রাখেন,সেটা থেকে নাকি আসল একটা শারস পাখি জন্ম হয় এবং ওই শারশ পাখিটা আপনার একটা ইচ্ছা পূরণ করবে। খুবই ইন্টারেস্টিং। জেমস ওয়েব টেলিস্কোপেও এই অরিগামিকে ইন্সপিরেশন হিসেবে নেওয়া হইসে। আরেকটা ব্যাপার এখানে ওরা ধরতে পারবে, সেটা হলো ডার্ক ম্যাটার। ডার্ক ম্যাটার হইতেছে মহাবিশ্বের সেইসব বস্তু যাদের সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণাই নাই। খুব সহজ কথায় পরীক্ষায় আপনি যে প্রশ্নগুলো আপনি পারেন না, যেগুলো সম্পর্কে আপনার ধারণা নাই ওগুলো একেকটা ডার্ক ম্যাটার। ঠিক তেমনি সাইন্টিস্টরাও মহাবিশ্বের যেসব জিনিস বুঝেই নাই,ওগুলোকে ডার্ক ম্যাটার নাম দিয়ে দিসে।কিন্তু সমস্যা হইতেছে এটা পুরা ইউনিভার্স এর ২৭%। এই জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ এতটা শার্প ইমেজ তুলতে পারে যেটা গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং এর মাধ্যমে কোনো জায়গায় কোনো ডিস্টার্বেন্স হইলে খুব সুক্ষ্মভাবে দেখায় দিতে পারবে যে এই জায়গায় ডার্ক ম্যাটার আছে।

এখন আসা যাক,এই জেমস ওয়েব টেলিস্কোপটা বানাইতে গিয়ে নতুন নতুন কি কি ইনভেনশন লাগছে! আল্টিমেটলি এটা বানানোটা এতটা সহজ জিনিস না।এই জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের মধ্যে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাইমারি মিরোর বসানো হইসে। সবচেয়ে বড় সান শিল্ড বসানো হইসে এবং এই টেলিস্কোপ পৃথিবীর ইতিহাসে আজ পর্যন্ত তৈরি করা সবচয়ে পাওয়ারফুল টেলিস্কোপ। এটার ৫ লেয়ার বিশিষ্ট একটা সান শিল্ড আছে যেটার নিচের পার্টটা সবসময় সূর্যের দিকে মুখ করে থাকবে। অর্থাৎ ঐটা বেশি গরম হবে, প্রায় ৩৫৮ কেলভিন পর্যন্ত যাইতে পারে এবং এটার প্রত্যেকটা লেয়ার এই তাপমাত্রাকে আস্তে আস্তে কমাইতে থাকে। শেষ পর্যন্ত এটার টপ সাইড যেটা থাকবে,সেটার একটা ক্রায়োজেনিক টেম্পারেচার রাখতে হয়। ক্রায়োজেনিক টেম্পারেচার মানে হইতেছে যে টেম্পারেচারে কোনো বস্তুর ভিতরকার অণু পরমাণু মনে হবে নড়াচড়া করছে না,এতটা ঠাণ্ডা হয়ে যায়। এটা এখানে প্রায় ৪০ কেলভিন এর মত ধরা হইতেছে।উপরের দিকের ইনস্ট্রুমেন্ট গুলোর জন্যে এটা গুরুত্বপূর্ন ঠাণ্ডা থাকাটা। তার কারণ ওরা ওখানে ইনফ্রারেড যে রশ্মিগুলো আছে, ঐগুলোকে ক্যাপচার করবে। ক্রায়োজেনিক টেম্পারেচার বা যথেষ্ট ঠাণ্ডা না হইলে সূর্যের যে রেডিয়েশনগুলো আছে, ওগুলো এখনো ধরা পইরা পুরা জিনিসটা একেবারে নষ্ট কইরা ফেলবে।

JWST এর অবজারভেরটিতে ৩ টা মূল উপাদান আছে। এক নম্বর ইন্ট্রিগেটেড সাইন্স ইনস্ট্রুমেন্ট মডিউল বা ISIM। এটার ভিতরেই মূলত ইনফ্রারেড ক্যামেরাগুলো আছে যেগুলো ০.৬ থেকে ৫ মাইক্রো মিটার পর্যন্ত তরঙ্গদৈর্ঘ্য ক্যাপচার করতে পারে। আরেকটা আছে মিড আইআর ক্যামেরা,যেটাকে মিরি বলে, এটা ৫ থেকে ২৮ মাইক্রো মিটার পর্যন্ত ইনফ্রারেড ধরতে পারে। দ্বিতীয় জিনিস অপটিকাল টেলিস্কোপ এলিমেন্ট বা OTE। এটাই আপনারা মূলত দেখেন, ৫.৬ মিটার ব্যাস এর একটা প্রাইমারি মিরর যেখানে ১৮ টা ষড়ভুজ আকৃতির এলিমেন্ট আছে। তৃতীয় জিনিসটাকে বলা হয় স্পেসক্রাফট এলিমেন্ট।এইখানে একটা সান শিল্ড থাকে যার ২ টা সাইড, একটা হচ্ছে গরম সাইড যাকে স্পেসক্রাফট বাস বলা হয়, আরেকটা হচ্ছে ঠাণ্ডা সাইড,ওইখানে OTE এবং ISIM এর মত সূক্ষ্ম যন্ত্রগুলো থাকে। 

এটা লঞ্চ করার প্রক্রিয়াটা খুবই কঠিন একটা কাজ ছিলো। এটাকে বলা হয় সিঙ্গেল স্পেস মিশন এর মধ্যে সবচেয়ে জটিল ডিপ্লয়মেন্ট, এর আগে মানুষ কখনোই ট্রাই করে নাই। এখানে ৩৪৪ টা সিঙ্গেল পয়েন্ট অফ ফেইলিয়ার এর আইটেম আছে। এর মানে হইতেছে এই পয়েন্টগুলোর একটা যদি ফেইল করে তাহলে পরেরবার আর কোনো পয়েন্ট কাজ করবে না। জেমস ওয়েব টেলিস্কোপটা এক মাস পর্যন্ত ট্রাভেল করবে এবং তারপর ওরা একটা পয়েন্ট এ পৌঁছাবে,যেটাকে বলা হয় লেগ্রাঞ্জ পয়েন্ট। লেগ্রাঞ্জ পয়েন্ট মানে কি! স্পেস এর মধ্যে অনেক বড় বড় ২ টা অবজেক্ট এর যে মহাকর্ষীয় টান থাকে,এইটা ওই পয়েন্ট এর কেন্দ্রমুখী বলের সমান হয়, যেই কারণে ওই পয়েন্ট এ আপনি যদি কোনো টেলিস্কোপকে রাখেন তাহলে ও খুব সহজে ওই বড় অবজেক্ট যেমন পৃথিবী পাশে বা সূর্যের চারপাশে ঘুরতে পারতেছে,এটার কারণে ওই টেলিস্কোপ এর জন্যে জ্বালানির ব্যাবহার অনেকটা কমানো সম্ভব হয়। স্পেস এর মধ্যে ৫ টা লেগ্রাঞ্জ পয়েন্ট আছে,জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের জন্যে রেডি করা হইসে লেগ্রাঞ্জ পয়েন্ট 2,তার কারণ এই জেমস ওয়েব টেলিস্কোপকে আপনি যদি সূর্য যে পাশে আছে সেই পাশে রাখার চেষ্টা করেন,তাহলে ঐটা গরম এর কারণে সিদ্ধ হয়ে যাবে। একটাই লেগ্রাঞ্জ পয়েন্ট আছে যেটা পৃথিবীর উল্টা পাশে,এটা হচ্ছে L2, এবং জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ ঐখানেই থাকবে। ফ্লাইট এর ৬ দিনের মধ্যে ওরা সেকেন্ডারি একটা মিররকে আনফোল্ড করবে। যদিও মনে হইতেছে মিরর টা সেকেন্ডারি এবং খুব অগুরুত্বপূর্ণ করো জিনিস, কিন্তু এটা যদি সাকসেসফুলি প্লেস করা না যায়, তাহলে এই ধরনের কোনো টেলিস্কোপই থাকবে না। ফাইনালি ১ মাস পরে যখন আসলেই যখন টেলিস্কোপটা L2 পয়েন্ট এর মধ্যে গিয়ে বসতে পারবে, কেবলমাত্র তখনই বিজ্ঞানীরা একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারবে। 

এর আগেও কিন্তু একটা টেলিস্কোপ ছিলো যার নাম হাবল টেলিস্কোপ, যেটার নাম আপনারা সব ফিজিক্স বইয়ের মধ্যে পড়ছেন। হাবল টেলিস্কোপে সমস্যা যেটা হইতো,সেটা ইনফ্রারেড রশ্মি মাত্র ০.৮ থেকে ২.৫ মাইক্রো মিটার পর্যন্ত ধরতে পারে। যেখানে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপটা আরো বড় রেঞ্জ এ প্রায় ০.৬ থেকে ২৮ মাইক্রো মিটার পর্যন্ত ইনফ্রারেড রশ্মি ধরতে পারে। যে কারণে হাবল টেলিস্কোপে শুধুমাত্র “টডলার গ্যালাক্সি” ধরতে পারতো( বাচ্চা কাচ্চা গ্যালাক্সি),সেই জায়গায় জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ তার থেকেও ছোট বেবি গ্যালাক্সিগুলোকেও ধরতে পারবে অনেক সূক্ষ্মভাবে। প্রশ্ন হইতে পারে ইনফ্রারেড রশ্মি কে কত ভালোভাবে ক্যাপচার করতে পারতেছে,এটা কেনো এত বেশি ইম্পর্টেন্ট এই টেলিস্কোপের ক্ষেত্রে! এই উত্তরটা কিন্তু আইনস্টাইন দিসেন তার জেনেরাল রিলেটিভিটির মধ্যে। সহজ কথা,পুরা ইউনিভার্স তো বড় হইতেছে, টাইনা টুইনা স্ট্রেচ হইতেছে,লম্বা হইতেছে। এখন মনে করেন অনেক আগে একটা তারা ছিলো,ওই তারা টা মইরা গেসে,ঐখান থেকে আলো আসতেছে যেটা পৃথিবীতে এখনো আইসা পৌঁছায় নাই,ধরেন একটু পরে আইসা পৌঁছাবে। এখন ইউনিভার্স যে লম্বা হইতেছে, রিলেটিভিটি বলতেছে যে এই আলোটা ঐখান থেকে এইখানে আসতেছে সেই আলোটাও টাইনা লম্বা হইতেছে। আমরা যেরকম জানি পুরা ইউনিভার্স ক্রমশ সম্প্রসারমান,সবাই একজন আরেকজনের কাছ থেকে দূরে সরে যাইতেছে। ঠিক তেমনিভাবে এই সম্প্রসারণের কারণে যে আলোটা আগে চিকন না কম তরঙ্গদৈর্ঘ্য বিশিষ্ট ছিলো,ঐটা যখন আমাদের কাছে আইসা পৌঁছাইতেছে তখন সেটা এত বেশি দূরত্ব অতিক্রম করার কারণে চিকন থেকে আস্তে আস্তে মোটা হয়ে যাবে বা তরঙ্গদৈর্ঘ্য বড় হয়ে যাবে। প্রশ্ন হইতেছে তরঙ্গদৈর্ঘ্য বড় হইলে সমস্যা কি! দৃশ্যমান যে আলো আছে সেটা কিন্তু ৪০০ থেকে ৭০০ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের হয়। এখন তরঙ্গদৈর্ঘ্য বড় হওয়া মানে এই ৭০০ ন্যানোমিটার থেকেও বেশি তরঙ্গদৈর্ঘ্য হবে। সেটা তখন দৃশ্যমান আলোর স্প্রেকট্রামের মধ্যে থাকে না,তখন সেটা ইনফ্রারেড রশ্মি তে পরে। তাহলে এবার বুঝতে পারতেছেন কেনো এতক্ষণ ইনফ্রারেড সম্পর্কে গেজানো হইতেছে। তার কারণ সৃষ্টির শুরুর দিকে যে স্টার বা গ্যালাক্সিগুলো ছিলো, ঐখান থেকে যে আলোগুলো আসবে ঐটা আসলে আপনি খালি চোখে দেখতে পাবেন না, ওগুলো আপনার সামনে ইনফ্রারেড আকারে আসবে। ওগুলো ক্যাপচার করার জন্যে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের মত এত সুক্ষ্ম যন্ত্রের দরকার। হাবল টেলিস্কোপের যে আয়নাটা ছিলো,ওইটা মাত্র ২.৪ মিটার ব্যাস বিশিষ্ট ছিলো যেখানে এই জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের আয়নাটা ৬.৫ মিটার ব্যাস এর। তার মানে এটা হাবল টেলিস্কোপের থেকে প্রায় ১৫ গুণ বেশি জায়গা কভার করে।

এখন এটা লঞ্চ করার ক্ষেত্রে একটা কেচাল আছে।লঞ্চটা কে করছে জানেন? এটা একটা আরিয়ান 5 রকেট এর মধ্যে নিয়ে গেসে। প্রশ্ন হইতেছে নাসা কেনো একটা আরিয়ান 5 ইউজ করছে? আরিয়ান 5 হইতেছে একটা ইউরোপিয়ান এজেন্সির রকেট আর নাসা হলো USA এর! কেনো নাসার কাছে কি স্পেস এক্স ছিলো না? ইলন মাস্ক এত বড় বড় কাজ করছে! স্পেস এক্স এর সাথে না কইরা কেনো আরিয়ান 5 এর সাথে করছে? আরিয়ান কে আসলে ওরা ২০০০ সালেই চুজ করে রাখছিলো কারণ ওরা নির্ভরযোগ্য একটা ইনস্টিটিউশন ছিলো এবং যেহেতু ইউরোপিয়ানদের সাথে পার্টনারশিপ এ কাজ করা হইতেছে,তাই এটা ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন এ একটা বড় মাহাত্ম্য রাখে। খেয়াল রাখবেন এই জেমস ওয়েব টেলিস্কোপটার মধ্যে কিন্তু শুধুমাত্র নাসাই কাজ করতেছে না,এখানে ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি এবং কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সি দুটোই কাজ করতেছে। তাছাড়া আপনি যখন কোনো যানবাহন দিয়ে একটা টেলিস্কোপকে উপরে নিয়ে যাবেন,ওই যানবাহনটির সম্পর্কে আপনার আগে থেকে জানা জরুরী।সে কারণে আরিয়ান এর সাথে আগে যে চুক্তি ছিলো সেটা নাসাকে অনেক বেশি পরিমাণে হেল্প করছে। এই জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ বানাইতে গিয়ে প্রায় ৩০ বছর সময়ে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের মত খরচ হয়ে গেছে। এটা তো শুধু নাসার খরচ। তাছাড়া ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ইউরো খরচ করছে এবং কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সি প্রায় ২০০ মিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার ইউজ করছে। এত বড় পরিমাণের খরচ যেটা আর ২ টা ঘটনার সাথে তুলনা দেওয়া যায়, এক হাবল টেলিস্কোপ এর ক্ষেত্রে এবং দুই লার্জ হেড্রন কোলাইডার নির্মাণ এর ক্ষেত্রে যেটা সার্ন এ হইসিলো এবং যেখানে গড পার্টিকেল আবিষ্কার করা হইসে। এইযে এত পরিমাণ টাকা আর সময় খরচ করা হইতেছে, এটা অবশ্যই যুক্তিযুক্ত কারণ হাবল টেলিস্কোপ থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৮ হাজার peer reviewed জার্নাল পেপার পাবলিশ হইসে। অনেক নতুন নতুন জিনিস জানা গেছে। তেমনিভাবে এক্সপেক্ট করা হইতেছে এই জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ থেকেও আমরা অনেককিছু জানতে পারবো। 

জেমস ওয়েব টেলিস্কোপটার নামকরণ করা হইসে জেমস ওয়েব এর নামে যিনি ১৯৯২ সালে মারা গেছিলেন এবং নাসার সেকেন্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেটর উনি ছিলেন। উনি সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত অ্যাপোলো প্রজেক্ট এর জন্যে যেটা উনি লিড করছিলেন এবং যেটার আন্ডারে মানবজাতি প্রথমবার চাঁদে পা রাখছিলো যেটা নিয়ে অনেকে ভুলভাল কথাবার্তা বলেন।জেমস ওয়েব এর লঞ্চ ডেট এতবার পিছানো হইসে! এটা নাকি প্রথম ঠিক করা হইসিলো ২০০৭ সালে লঞ্চ করবে,তারপর কি কি যেনো ঝামেলা হইসে।২০১১ সালে আবার প্রস্তাব দেওয়া হইসিলো যে এটার বাজেট টা কাট করে ফেলি আমরা,পরে কোনো এক কারণে নাসা এটা কন্টিনিউ করে গেসে। এই ডিসেম্বর এ এসেও বহুত নাটক হইসে,প্রথমে একবার বলছে ২২ তারিখে লঞ্চ করবে,কিন্তু করে নাই।২৪ তারিখ লঞ্চ করবে বলছিলো, ওইদিনেও করে নাই।এরপর ২৫ তারিখ সন্ধ্যা ৬:২০ মিনিটে আল্টিমেটলি ঐটা লঞ্চ করছে। এটা নিয়ে বহুত meme পাবলিশ হইসে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.